অনলাইনেও হামলার শিকার ফিলিস্তিনিরা

আন্তর্জাতিক ফিচার

স্বাধীনভাবে চলাফেরার করার মতো অল্প যে কয়েকটি জায়গা ফিলিস্তিনিদের রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ইন্টারনেট। তবে সেই ইন্টারনেটেও হামলা-অবদমনের শিকার হচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনি ও তাঁদের সমর্থকেরা ইন্টারনেটে ব্যাপক নজরদারিতে রয়েছেন। পাশাপাশি ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলোতে তাঁদের বিরুদ্ধে কাজ করছে ‘ডিজিটাল দখলদার’ বাহিনী।

আরব সেন্টার ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যতম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক একদিকে যেমন ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনপন্থীদের পোস্ট অপসারণ করছে অপরদিকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক পোস্ট প্রচার করছে।

মূলত ইসরায়েল সরকারের বর্ণবাদমূলক আইনের প্রয়োগকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে ফেসবুক। এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী একটি পিটিশন চালু করতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনপন্থী ইহুদিদের একটি সংগঠন জিউইস ভয়েসেস ফর পিস (জেভিপি)।

আগামী মঙ্গলবার ও বুধবার তথ্য কেলেঙ্কারি ও গোপনীয়তা ইস্যু নিয়ে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেবেন। ব্রিটিশ কোম্পানি কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার বিষয়ে এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে তথ্য বিকৃতির অভিযোগের বিষয়ে ফেসবুকের প্রধানকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করবেন মার্কিন রাজনীতিকেরা। এটাই দেখার বিষয় যে, ফিলিস্তিন এবং ফিলিস্তিনপন্থী ফেসবুক ব্যবহারকারীরা যে অবদমনের সম্মুখীন হচ্ছেন—সেই ইস্যুটি তোলা হয় কিনা। তবে এই ইস্যুতে যে জাকারবার্গ মার্কিন রাজনীতিকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন না সেটা বলাই বাহুল্য।

আর এ কারণেই ফিলিস্তিনপন্থী ইহুদিদের সংগঠন জেভিপি জাকারবার্গকে চাপে ফেলতে ‘ফিলিস্তিনদের ওপর অবরোধ বন্ধ করুন’ শীর্ষক একটি বৈশ্বিক প্রচারণা শুরু করেছে। একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জেভিপি জানিয়েছে, প্রতি ৭১ সেকেন্ডে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ একটি করে পোস্ট অনলাইনে আপলোড হয়। শুধু ২০১৭ সালেই এ ধরনের চার লাখ ৪৫ হাজার পোস্ট আপলোড হয়। ওই প্রতিবেদনের প্রকাশ করেছে আরব সেন্টার ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সোশ্যাল মিডিয়া। প্রতিষ্ঠানটির এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর ইহুদিদের ওপর চাপ প্রয়োগকারী সংগঠন এবং ফিলিস্তিনপন্থী অন্য সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও মার্কিন কংগ্রেস সম্ভবত বিষয়টি এড়িয়ে যাবে।

জিউইস ভয়েসেস ফর পিসের (জেভিপি) উপপরিচালক আরি ওহফেলার বলেন, নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া নয়টি পোস্টের মধ্যে একটির বিষয়বস্তু থাকে, ফিলিস্তিনদের ওপর নির্যাতনের আহ্বান এবং তাঁদের প্রতি অভিশাপ সংবলিত। এবং ইসরায়েলে প্রতি ৭১ সেকেন্ডে একটি করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ পোস্ট আপলোড হয়। আর প্রতি বছর ফিলিস্তিনপন্থীদের ১০ হাজার পোস্ট ফেসবুক অপসারণ করে থাকে।

হাস্যকরভাবে ফেসবুক দাবি করে থাকে, তাদের মিশন হলো, বিশ্বকে একত্র করা। ওহফেলার বলেন, একত্র করার পরিবর্তে ফেসবুক ‘ফিলিস্তন ও ইসরায়েলের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করছে।’ বর্তমানে জেভিপি জাকারবার্গ ও ফেসবুকের ‘ভণ্ডামি’ তুলে ধরে ফিলিস্তিনি এবং তাঁদের সমর্থকদের ওপর অবদমন চালানো বন্ধ করতে বিশ্বব্যাপী পিটিশন চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফেসবুকে ফিলিস্তিনিদের ওপর অবদমনের পাশাপাশি জেভিপি ফেসবুকের বিরুদ্ধে ইসরায়েল সরকারের হয়ে বেশ কিছু ‘নোংরা কাজ’ করার অভিযোগ করেছে।

পিটিশনে সবাইকে সই করার আহ্বান জানিয়ে ফেলার উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিককালে ফেসবুক ফিলিস্তিনিদের ও ফিলিস্তিন গণমাধ্যমের কয়েক শ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত গণমাধ্যম সাফা প্যালেস্টিনিয়ান প্রেস এজেন্সির অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার অনুসারী সংখ্যা ১৩ লাখ।

উসকানি বন্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি চুক্তির আওতায় ফেসবুক এসব করছে বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে। কিন্তু তারা মূলত কাজ করছে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে ফিলিস্তনপন্থী কর্মী এবং সন্ত্রাসীদের এক করে ফেলা ইসরায়েলের বর্ণবাদী আইনের পক্ষে। এবং ফেসবুকের এসব নোংরা কাজ নিয়ে মোটেই লজ্জিত নয় ইসরায়েল সরকার। ওই সরকারই বলছে, তারা ফেসবুককে ১২ হাজার পোস্ট সরিয়ে ফেলতে বলে।

ওহফেলার বলেন, জেভিপির পিটিশন যখন জাকারবার্গ পাবেন, তখন তাকে জানানো হবে, ‘ফেসবুক ‘কার্যত’ ইসরায়েল সরকারের বর্ণবাদী আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে’।

ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গ দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন তাদের কোম্পানির মিশন হলো বিশ্বকে উন্মুক্ত ও সংযুক্ত রাখা। জাকারবার্গ মনে করেন, এমন বিশ্ব সবার জন্যই আদর্শ। তবে এই মুহূর্তে যদিও জাকারবার্গের উদ্ভাবিত ফেসবুক ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষ ও সহিংসতা উসকে দিতেই কাজ করছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।